পড়ুন: হযরত উসমান (রা) এর একটি ঘটনা


ইসলাম জাহানের চতুৰ্থ খলিফা হযরত উসমান (রা) কে জাহেলী যুগের কোন অপকর্ম স্পর্শ করতে পারেনি। যুবক বয়স থেকেই তিনি অন্যান্য অভিজাত কুরাইশদের মত ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করেন। অসীম সততা ও বিশ্বস্ততার বলে ব্যবসা-বাণিজ্যে অগাধ সাফল্য লাভ করেন। তৎকালীন সময়ে মক্কার লোকেরা তাই তাকে ধনী ব্যবসায়ী হিসাবে ‘গনী’ বলে ডাকতেন। আর এসব সম্পত্তি তিনি আল্লাহর রাসূলের নির্দেশ ইসলামের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অকাতরে দান করতেন। 

মুল ঘটনায় আসা যাক 

রাসূলুল্লাহ সাঃ এর নিকটে একদিন এক অসহায়-গরিব লোক কিছু সাহায্যের আবেদন করল। তাকে সাহায্য করার মতো রাসূল সাঃ কাছে তেমন কিছু ছিল না। তাই তিনি হযরত উসমান এর  কাছে লোকটিকে পাঠিয়ে দিলেন। নিঃস্ব লোকটি হযরত উসমান এর বাড়িতে গেলেন। সেখানে গিয়ে দেখতে পেলেন যে একদল পিঁপড়ে একটি শস্য স্তূপ থেকে অনেক শস্য তাদের গর্তে নিয়ে যাচ্ছে। তখন হযরত উসমান শস্যগুলি একত্রিত করলেন। তারপর কিছু শস্য পিঁপড়ে গুলির গর্তের কাছে ছড়িয়ে দিলেন। বাকীগুলি শস্যগুলি আবার স্তূপে রেখে দিলেন।

এ দৃশ্য দেখে লোকটি অবাক হয়ে গেল। তিনি মনে করলেন, যে ব্যক্তি এতো হিসাবী তিনি কি আর আমাকে সাহায্য করবেন। তার মনে ধারণা হলো যে হযরত উসমান খুব কৃপণ। সামান্য কিছু শস্য যিনি পিপড়ার মুখ থেকে কেড়ে নিতে পারেন তার কাছে সাহায্য চাওয়া বোকামী ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই লোকটি কিছুই না চেয়ে চলে গেল।

পরেরদিন লোকটি আবার রাসূলের দরবারে গেল এবং পুনরায় কিছু সাহায্য চাইল। সে রাসূলকে বলল যে উসমান (রা) বড় কৃপণ। তার নিকট সাহায্য চাওয়া বৃথা। তাই সে কিছুই না চেয়ে চলে এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সা) তখন তাকে আবারও হযরত উসমান রাঃ নিকট পাঠালেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও গেল এবং দেখতে পেল যে হযরত উসমান (রা) তাঁর চাকরকে বাতির সলতে উঁচু করে দেয়ার দায়ে বকাঝকা করছেন ?

কারণ সলতে উচু করে দিলে অধিক তেল খরচ হয়। লোকটি মনে মনে ভাবলো, একি কান্ড! সামান্য একটু তেলের জন্য বকাঝকা করছে। আমার বাড়িতে আলোতো এর চাইতে আরো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে আর আমি  কখনও এরূপ তেলের হিসাব করি না। হযরত উসমানের (রা) কৃপণতা সম্বন্ধে তার ধারণা আরো জোরদার হলো। এমন ব্যক্তির নিকটে কিভাবে সে টাকা চাইতে পারে। তাই এবারও কিছু না চেয়ে আবার ফিরে গেল।

তারপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিকটে যেয়ে হযরত উসমান (রা) এর বিরুদ্ধে কৃপণতার অভিযোগ তুলল। অভিযোগ শুনে রাসূল (সা) মৃদু হাসলেন। তিনি লোকটিকে আবার হযরত উসমান (রা) কাছে যেতে বললেন এবং কোনো কাৰ্পন্যতা না করে কিছু চাইতে আদেশ দিলেন। লোকটি তৃতীয়বারের মতো হযরত উসমানের নিকট গেলেন। গিয়ে দেখলেন হযরত উসমান (রা) এর   বাড়ীতে তুলা শুকাতে দেয়া হয়েছে। তুলা যাতে উড়ে যেতে না পারে জাল দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। তারপরও জালের সুক্ষ ছিদ্ৰ দিয়ে কিছু তুলা বের হয়ে উড়ে যাচ্ছিল। এজন্য হযরত উসমান (রা) সেগুলিকে ধরে আবার জালের নিচে রাখছেন।

এ দৃশ্য দেখে লোকটি তাজ্জব বনে গেল। তার মন অত্যন্ত বিরূপ হয়ে উঠলো। ভাবলো এমন কৃপণ ব্যক্তি কি কিছু দান করতে পারে? তবুও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে তিনবার এখানে পাঠিয়েছেন। এখন ফিরে গেলে কেমন দেখায়।যা হবার হোক চেয়েই দেখি। কিছু দিলে দিক না দিলে নাই। তিনি উসমান (রা) এর কাছে গিয়ে বললেন যে রাসূল (সাঃ) পাঠিয়েছেন আমাকে কিছু সাহায্য দেয়ার জন্য।

হযরত উসমান (রা) ভাবলেন, লোকটিকে কি দেওয়া যেতে পারে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) যাকে পাঠিয়েছেন তাকে তো অবশ্যই প্ৰয়োজনাতীত সাহায্য করতে হবে। কেননা তার চাইতে সাহায্য নেওয়ার যোগ্য আর কেই বা হতে পারে? তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন। তাকে কি সাহায্য দেয়া যায় যাতে সে সন্তুষ্ট হয়। তখন তিনি বেশ দুরে একটি সরু রেখা দেখতে পেলেন। বুঝতে পারলেন এটি একটি কাফেলা দল। মনে পড়ে গেল তার যে একটি কাফেলা দল ব্যবসার জন্য সিরিয়া গিয়েছিল।

তিনি খুশি হয়ে একটি চিঠি লিখে লোকটিকে কাফেলার নিকট যেতে বললেন। কিন্তু লোকটি চিঠিটা হাতে নিয়ে ইতস্তত করছিল। কেননা তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। তিনি হয়ত মশকরা করছে তার সাথে। কারন চিঠিতে লিখা আছে যে ঐ কাফেলার সবচেয়ে ভাল এবং বেশি মালপত্ৰ আছে সেটিই সে বিনা পয়সায় নিতে পারবে।

কৌতুহল হয়ে লোকটি কাফেলার নিকট গেল। সবচেয়ে ভালো এবং উটটি সে পছন্দ করল এবং সেটি সে নিতে চাইল। কাফেলার প্ৰধান তাকে অনুমতি দিলেন। কিন্তু সে যখন উটটিকে কাফেলা হতে সরিয়ে নিতে যাচ্ছিল তখন সবগুলো উটই তার উটকে অনুসরণ করল। পিছু পিছু যেতে লাগল। তখন কাফেলার লোক বাধ্য হয়ে তাকে থামিয়ে বললো যে আস্তানায় ফিরে যাওয়ার পর উটটি দেয়া হবে। এখবর হযরত  উসমান (রা) নিকট পৌছে দেয়া হল যে, একটি উটকে কাফেলা হতে সরিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

খবর শুনে হযরত উসমান (রা) বলে দিলেন এটা হয়ত আল্লাহর ইচ্ছা। তিনি হয়ত চাচ্ছেন কাফেলার সবগুলি উটের মালিক  লোকটি হোক। তাই সন্তুষ্টচিত্তে তিনি সবগুলো উটই লোকটিকে দিয়ে দিতে বললেন। লোকটিতো বিস্ময়ে হতবাক। এও কি সম্ভব! অতো বড় কৃপণ সে কিভাবে এতো দান করছে।

লোকটি আর চুপ থাকতে পারল না। এর রহস্য জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে গেল। তাই সে পূর্ববর্তী ঘটনা সমূহ বলল। 

সব শুনে হযরত উসমান (রা) যা বললেন তার সারমর্ম এই যে, মহান আল্লাহ বিশ্ব জগতের সমস্ত সম্পদের মালিক। আর মানুষ হলো তত্ত্বাবধানকারী বা পাহারাদার। মানুষতো শুধু আল্লাহর ইচ্ছানুসারে সম্পদ প্ৰয়োজনমতো ব্যবহার করতে পারবে এবং তা শুধু কল্যাণের পথে।

মানুষের কাজ হলো আল্লাহর সম্পদ নিজের মর্জিমত রক্ষণাবেক্ষণ করা। যদি কোনো ব্যক্তির তত্ত্বাবধানকালে কোনো সম্পদের এক কণামাত্র বিনষ্ট হয় তবে তার জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সম্পদের অধিকার শুধু বিশেষ সুবিধা নয়, বরং একটি বিরাট দায়িত্ব।”


সাহাবীদের জীবনী গল্প পড়তে নিচের লিংকগুলোতে ক্লিক করুন

১ দুই মুসাফির = আট দিরহাম

২ অত্যাচারী বাদশা ও ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর ঘটনা

৩ হযরত আবু বক্কর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর কয়েকটি ঘটনা

৪ আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর মায়ের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের একটি ঘটনা

৫ হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ও কাজী সুরাইহার একটি বিচার

৬ ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ও তার সৎ পুত্রবধূর একটি ঘটনা

৭ ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর ইসলাম গ্রহণ মানেই মুসলমানদের বিজয় যাত্রা

৮ ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু কে যে চারটি প্রশ্ন করেছিল খ্রিস্টান বাদশাহ

 ৯ হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর ন্যায়বিচারের ঘটনা

Post a Comment

0 Comments