আয়ান ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে।
পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান বলে খুব আদুরে। তবে বয়সে ছোট হলেও সে যথেষ্ট ভদ্র ও বুদ্ধিমান। পিতা-মাতার সাথে ঘোরাঘুরি করা আয়ানের খুব পছন্দ।
নদীতীরে ঘুরতে যাবে বলে বাবার নিকট কিছুদিন যাবত বায়না ধরেছে।কিন্তু তার বাবা শফিক সাহেব ব্যস্ত থাকায় ঘুরতে যাওয়া হয়না।
অবশেষে একদিন এলো সেই সুবর্ণ সুযোগ। সারাদিন বৃষ্টি হচ্ছে। বিকালের দিকে বৃষ্টি একটু থামলে আয়ান চলল তার বাবার সাথে নদীর তীরে ঘুরতে।
তবে আয়ান এই বৃষ্টির দিনে ঘুরতে যেতে চায়নি। কেউই তো আর বৃষ্টির দিনে ঘুরতে যাবে না। শফিক সাহেব বললো, আজকে না গেলে আর কখনো ঘুরতে নিয়ে যাবে না। তাই সে বাধ্য হয়ে বৃষ্টির মধ্যেই যাচ্ছে নদী তীরে ঘুরতে।
তাদের সাথে অবশ্য আয়ানের দাদুও যাচ্ছে। অতি বৃদ্ধ দাদু শারীরিক দুর্বলতার কারণে হাঁটতে পারে না। তাই তাকে নেয়া হচ্ছে ঝুড়িতে করে।
দাদু বাকপ্রতিবন্ধী অর্থাৎ কথা বলতে পারেন না। তবে দাদুর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে তার মনটা খুব খারাপ। তিনিও বোধহয় যেতে চাচ্ছেন না।
আয়ানের মাথায় একটা বিষয় খুব ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো তার দাদুকে কেন সাথে নেয়া হচ্ছে। তিনি তো কয়েকদিন ধরে অসুস্থ। বেশ কিছুক্ষণ পর আয়ান তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, "বাবা! দাদু কি আমাদের সাথে যাচ্ছে?
শফিক সাহেব বললেন, "হ্যাঁ,তোমার দাদুও আমাদের সাথে যাচ্ছে"।
আয়ান বলল, "বাবা, তুমি বোধহয় জানো না,দাদু বেশ কয়েকদিন ধরে খুব অসুস্থ। এমন অবস্থায় তার শরীরটা আরো খারাপ হয়ে যাবে।
ছেলের কথা শুনে শফিক সাহেব কোনো প্রতিত্তর না করে একদম চুপ গেলেন। তবে মনে মনে কিছু একটা ভাবছে এটা আয়ান বেশ বুঝতে পারল।
এবার একটু অতীতে আসা যাক।
দাদুর নাম আজমল হোসেন। বয়সের ভারে আজ তিনি নির্বাক শ্রোতা। কথা বলতে অক্ষম। সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকা আর তিন বেলা আহার করাই তার নিত্যদিনের কাজ। সাধারণ অর্থে তিনি কর্মহীন।
অবশ্য শফিক সাহেবের স্ত্রী রাজিয়া বেগম তাকে কর্মহীন মনে করেন না। তার মতে শশুরেরও একটা পেশা আছে তা হল পেট ভোজনকারী (অন্য ধ্বংসকারী)।
পৃথিবীতে যত ছেলের বউ আছে যারা বৃদ্ধ শ্বশুরকে পরিবারের বোঝা মনে করে তাদের মধ্যে রাজিয়া বেগম অন্যতম হবেন হয়তো। দুই চোখে দেখতে পারেনা আজমল সাহেবকে।
একমাত্ৰ ছেলের বউ হিসেবে তাকেই যে শ্বশুরের খেদমত করতে হয়। তিনি এযুগের আধুনিক মর্ডান বৌ। তাই শশুরের সেবা তার কাছে অসহ্য লাগে।
এ বিষয় নিয়ে স্বামী শফিক সাহেবের সাথে মাঝে মধ্যে অনেক ঝগড়াও হয়। একদিন শফিক সাহেব কে সাফ জানিয়ে দিলেন যদি পিতাকে চাও তবে আয়ান ও আমাকে ছাড়তে হবে। আর যদি আমাদের চাও তাহলে পিতাকে ছাড়তে হবে।
এবার বর্তমানে আসা যাক।
নদীতীরে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি পর শফিক সাহেব তাদেরকে পাশের এক জঙ্গলে নিয়ে আসলেন।
আয়ান বলল, "বাবা, তুমি আমাদের এখানে নিয়ে এলে কেন?"
শফিক সাহেব বললেন, "তোমার দাদু কে এখানে রেখে যাবো তাই"।
একথা শুনে আয়াত অবাক হয়ে গেল।
সে বলল, "কেন বাবা! দাদুকে রেখে যাবে কেন?
শফিক সাহেব বললেন, "কারণ তোমার দাদু একটা অকৰ্মা। সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকে কোন কাজ তো করতে পারে না শুধু খায় আর ঘুমায়। আর তার সেবা করা লাগে। আমাদের তো কোন উপকার করতে পারেই না উল্টো তাকেই নিয়ে যত ঝামেলা। কি লাভ তাকে বাসায় রেখে?
আর তোমার আম্মুও চায় না যে উনি আর আমাদের সাথে থাকুক। তাই উনাকে এখানে ফেলে চলে যাব।
বাবার এরকম কথা শুনে ঘাবড়ে যায় আয়ান। সে ভাবতে পারছেনা, তার বাবা কেন দাদুর সাথে এমন করবে। তবে সে কিছুতেই দাদুকে এখানে রেখে যাবে না। কারণ দাদুকে সে খুব ভালোবাসে। এই দাদুর সাথেই তো সে সারা দিন পার করে। ইশারায় কথা বলে তারা। আম্মুকে ফাঁকি দিয়ে দাদুর সাথে খুনসুটিতে মেতে থাকে।
আয়ান বলল, "ঠিক আছে বাবা, দাদুকে আমরা এখানে ফেলে যাবো। তবে দাদুকে বহন করা যে ঝুড়িটা আমরা নিয়ে এসেছি ওটা কিন্তু অবশ্যই সাথে নিয়ে যাব"।
সামান্য ঝুড়ির প্রতি এত আগ্রহ দেখে শফিক সাহেব ছেলেকে বললেন," কেন আয়ান? তুমি এই ঝুড়ি দিয়ে কি করবে।"
আয়ান বলল,"বারে, তুমিও তো এক সময় দাদুর মত বুড়ো হয়ে যাবে। আর তখন আমি বড় হয়ে যাব। বিয়ে করে সংসার করবো। সেই সময় তুমি তো কোন কাজ করতে পারবে না। শুধু খাব আর ঘুমাবা। তখন তোমার কারনে আমার ও আমার স্ত্রীর মাঝে মনোমালিন্য সৃষ্টি হবে। তাই শুধু শুধু টাকা খরচ করে নতুন ঝুড়ি কিনতে যাব কেন? এই ঝুড়িতে করেই তোমাকে নাহয় দাদুর মত এখানে রেখে গেলাম।
ছোট্ট ছেলের কথাগুলি রফিক শফিক সাহেবের একদম কলিজাতে আঘাত করলো। তিনি হঠাৎ চমকে উঠলেন তার। বিবেক নাড়া দিয়ে উঠল। হঠাৎ করে নিজের ভুল বুঝতে পারলেন।
তিনি ভাবতে লাগলেন তিনি তো মহা পাপ করতে যাচ্ছিলেন। তাকে জন্ম দেয়ার পূর্ব থেকে তার বাবা-মাই তো তাকে বড় করেছে। যখন সে ছোট ছিল তখন তো পিতা-মাতাই তার আশ্রয় কেন্দ্র ছিল।
আজ সে বড় হয়ে সমাজে যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেতো পিতামাতার হাড়ভাঙ্গা খাটুনি ও তাগ্যের জন্যই। মা হঠাৎ করে মারা গেছে অনেক আগেই। যে মা তাকে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করলো। লালন-পালন করে তাকে বড় করল। সেই মমতাময়ী মায়ের কোন সেবা করার সুযোগ সে পায়নি।
কিন্তু আজ বাবা বেচে আছে। বাবা বৃদ্ধ হয়ে যেন শিশু হয়ে গেছে। শিশুকালে যেমন তাকে বুকের মধ্যে আগলে রেখেছে তেমনি এখন তার উচিত বাবাকে আগলে রাখা। মৃত্যু পর্যন্ত তার সর্বোচ্চ সেবা-যত্ন নেওয়া।
0 Comments