ইতিহাসের পাতায় যত সংখ্যক দয়াবান, প্ৰজাবৎসল, ন্যায়পরায়ণ সুলতানের নাম স্বৰ্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়েছে তাদের মধ্যে একজন হলেন সুলতান মুরাদ।
তিনি ছিলেন অটোমান সাম্ৰাজ্যের অধিপতি, যিনি ধৰ্মীয় দিক থেকে ছিলেন অত্যন্ত ধাৰ্মিক, পরহেযগার ও আল্লাহভীরু।
এছাড়াও জানা যায়, তিনি এতটাই প্ৰজাবৎসল ছিলেন যে লোকেদের ভালো মন্দ অবস্থা দেখার জন্যে রাতের বেলা ছদ্নবেশে তার সমস্ত রাজ্য ঘুরে দেখতেন।
এই মহান শাসকের জীবনী পড়লে আমরা অনেকগুলো শিক্ষনীয় ঘটনা জানতে পারি। এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো।
একদিন রাতে তার এক ভৃত্যকে সাথে নিয়ে বের হলেন রাজ্যের লোকদের অবস্থা পৰ্যবেক্ষণ করার জন্য।
সমস্ত অলি-গলি ঘোরাঘুরি শেষে তারা একটি জনবহুল স্থানে এসে দেখলেন, এক লোক রাস্তায় চিৎ হয়ে পড়ে রয়েছে।
তিনি লোকটিকে জাগানোর জন্য অনেকক্ষন যাবৎ চেষ্টা করে বুঝলেন, লোকটি মৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
তবে একটা বিষয় তাকে হতবাক করলো। চারপাশে মানুষে গিজগিজ করছে। কতশত লোক এ পাশ দিয়ে যাতায়াত করছে।
পাশে লোক মরে আছে, অথচ কেউ দৃষ্টি দিচ্ছে না। ব্যাপারতো নিশ্চয়ই একটা আছে।
সুলতান তার ভৃত্যকে দিয়ে আশেপাশের লোকজনদের ডাকলেন।
বিরক্ত ভাব নিয়ে কিছু লোক এগিয়ে এলো। কিন্তু তারা তাদের ছদ্নবেশী সুলতানকে চিনতে পারল না।
সুলতান সবার উদ্দেশ্যে বললেন, "এভাবে একটি লোক মরে পড়ে আছে, অথচ কেউ এগিয়ে আসছে না কেউ? কেন তাকে বাড়িতে পৌছে দেয়া হয়নি? তার কি পরিবার নেই? মনুষ্যত্ব আজ কোথায় ঠেকেছে! সবাই কি ধৰ্মহীন হয়ে গেছে"?
একথা শুনে এক লোক ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল, "আপনি কার কথা বলছেন! চিনেন একে? এতো একজন পাপিষ্ঠ, কুলাঙ্গার। ব্যাভিচারী করা, মদ্যপান করা ছিল যার নিয়মিত অভ্যাস।
একথা শুনে সুলতান থমকে গেলেন। তারপর একটু উপদেশের সুরে বললেন, "সে যেমনই হোক তাতে ক্ষতি? তার কৃতকর্মের সাজা অবশ্যই সে পাবে। আমাদের দায়িত্ব অবশ্যই পালন করতে হবে। আর, তাছাড়া সে তো আমাদের নবী কারীম (সাঃ) এর একজন মুসলিম উম্মত। তাকে তো দাফন করতে হবে, নাকি? তাই কথা না বাড়িয়ে আগে একে তার বাড়িতে নিয়ে চলুন।
সুলতানের কথায় তাদের মন একটু নরম হলো। সবাই ধরাধরি করে মৃত লোকটিকে বাড়িতে নিয়ে গেলেও সুলতান ও তার ভৃত্য ছাড়া বাকি সবাই চলে গেল।
সুলতান বাড়িতে হাক দিলেন। তখন বাড়ির এক মহিলা তার স্বামীর লাশ দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।
কান্না করতে করতে বলল, হে আমার স্বামী! নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনার প্রতি সদয় থাকবেন। আমি তো দেখেছি আপনি কতটা নিষ্ঠাবান ছিলেন। আল্লাহ অবশ্যই আপনাকে রহম করবেন।
মহিলাটির কথা শুনে সুলতান আশ্চর্য হয়ে গেল। পাপিষ্ঠ স্বামীর প্রতি মহিলাটির কেন এত বিশ্বাসতা? জানার জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে গেলেন।
তাই মহিলাকে বললেন, "যতদুর দেখলাম আপনার স্বামীকে তো সবাই ব্যভিচারী ও মদখোর বলতেছে, তাহলে সে নিষ্ঠাবান ও সৎ হয় কি করে? সমাজের লোকেদের কাছে আপনার স্বামী এতটাই নিকৃষ্ট ঘৃন্য যে তার মৃত্যু নিয়ে কারো মাথাব্যাথা নেই। কেউ তো লাশটা পর্যন্ত বাড়িতে নিয়ে আসলো না!
সুলতানের কথা শুনে মহিলাটি অবাক না হয়ে বললেন, 'আমি জানতাম এমনটাই হবে। লোকেদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমার স্বামী একজন নেক, পরহেজগার ব্যক্তি। তিনি কোনদিন ব্যভিচারী ও মদ পান করেন নি।
সুলতান তখন অবাকের চরম মাত্ৰায়। তিনি সত্যিটা জানতে চাইলেন।
তখন মহিলাটি বললেন, "আমার স্বামী প্রতিদিন রাতে সরাইখানা থেকে মদ কিনে সম্পূর্ণ মদ নর্দমায় ফেলে দিতো। এ কাজ করে তিনি বলতেন, 'আমি একজন মুসলমানকে একটুখানি মদ খাওয়া থেকে বাচালাম'।
এরপর তিনি পতিতালয়ে যেয়ে একজন পতিতাকে সম্পুৰ্ন রাতের জন্য কিনে ভোর পর্যন্ত কোরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন।
একাজ করে তিনি বলতেন, আজ একজন পুরুষ ও মহিলাকে ব্যভিচারীর মতো জঘন্য পাপ হতে বাঁচালাম।
সবাই তাকে মদ কিনতে আর পতিতালয়ে যেতে দেখতো। এজন্য তাকে ব্যভিচারী ও মদখোর বলতো।
কিন্তু আমি আমার স্বামীকে কে কখনোই খারাপ কাজ করতে দেখি নি। একদিন আমি আমার স্বামীকে বললাম, সবারই তো আপনার প্রতি কুধারণা। আপনি যখন মারা যাবেন তখন কেউ তো আপনার পাশে আসবে না। আর জানাজা ও দাফন করতেও আসবে না। সবাই তো আপনাকে ঘৃণা করে।
একথা শুনে আমার স্বামী হেসে বলেছিলেন, "তুমি একদম চিন্তা করো না। তুমি দেখে নিও, ঈমানদারদের সুলতান আর ধার্মিক ব্যক্তিরাই আমার জানাজায় শরিক হবে"।
সুলতান মুরাদ এই কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। লোকটির কথাই তো সত্যি হলো। এমন মহৎ লোকের প্রতি পরম শ্রদ্ধা-সম্মানে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।
তারপর বললেন, "আল্লাহর কসম! আপনার স্বামীর ঠিকই বলেছে। আমি সুলতান মুরাদ।
আমি কথা দিচ্ছি, আমি নিজে আপনার স্বামীকে গোসল করিয়ে, জানাজা নামাজ পড়িয়ে সম্মানের সহিত দাফন করবো"।
পরদিন সুলতান মুরাদ, দেশের আলেম-ওলামা, সকল ধর্মপ্রাণ মুসলিম সবাই তার জানাজায় অংশগ্রহণ করলো।
এই ঘটনা থেকে আমাদের অবশ্যই অনেক কিছু শেখার আছে।
আসলে বাহ্যিকভাবে আমরা যা দেখি বা শুনি, তা থেকে কখনোই একজনকে বিচার করা ঠিক না। একজন মানুষের অন্তর টা কেমন তার অন্তস্থলে কি চলে, তাতো সে ও আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
আল কুরআনুল কারীমে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেন,
হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান তো পাপ।*
আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গীবত করো না।
তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাকো।
আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো।
নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তাওবা কবুলকারী, অসীম দয়ালু। (কুরআন, ৪৯ঃ ১২)
0 Comments