বলছি আব্বাসীয় খিলাফত কালের একটি ঘটনা। একদিন খলিফা হারুনুর রশিদ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন এক ভিক্ষুক তার পথ আগলে দাড়িয়ে কিছু চাইল। তিনি ভিক্ষুকটিকে কিছু টাকা দিয়ে চলে যেতে লাগলেন। কিন্তু ভিক্ষুকটি তখন তার হাত টেনে ধরে বললেন যে চলে যাওয়ার আগে তার মাথা সজোরে আঘাত করতে।
কৌতুহলী হলে খলিফা বললেন, "কেন হে! আপনার কপালে আঘাত করবো কেন? এটাতো মোটেও উচিত নয়। ভিক্ষুকটি বলল, "আমাকে আঘাত না করলে আপনার টাকা ফিরিয়ে নিন? তখন খলিফা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার কপালে হালকা আঘাত করে চলে গেল। পথ চলতে চলতে খলিফা সকলের নিকট জেনে নিল ভিক্ষুকটি সবার ক্ষেত্ৰেই এমন করে থাকে। কেউ যদি তার কপালে আঘাত না করে তবে সে ভিক্ষা নেয় না। বিষয়টি খলিফাকে ভাবিয়ে তুললো। তার মনে হলো, এই ভিক্ষুকের নিশ্চয়ই কোন অতীত ইতিহাস আছে। তা না হলে কেউ এমন করে, নাকি!
রাজদরবারে পৌছেই তিনি ভিক্ষুকটিকে ডেকে পাঠালেন। ভিক্ষুকটি উপস্থিত হলে খলিফা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি ভিক্ষা নেওয়ার সময় সবাইকে মাথায় আঘাত করতে বলেন কেন? আর সবাই তো বিব্ৰত বোধ করে। এর পিছনে কি কোনো রহস্য আছে? খলিফার কথা শুনে ভিক্ষুকটির চোখে পানি চলে এলো। সে কেঁদে কেদেঁ বলল, হুজুর, আমার জীবনে একটি অতীত ঘটনা আছে। যার ফলে আমি এরুপ করে থাকি।
খলিফা বলল, "কি সেই ঘটনা যদি বিস্তারিত একটু বলতেন?
ভিক্ষুকটি তার ভাষায় বলতে লাগলো, "
একসময় আমি ধনী ব্যক্তি ছিলাম। ব্যবসা-বাণিজ্য করে আমি অনেক সম্পদের মালিক ছিলাম। কিন্তু এতে আমি সন্তুষ্ট ছিলাম না। আমার সম্পদের প্ৰতি প্ৰবল আকৰ্ষণ ছিল। তাই আমি মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা করতাম। আমার ব্যবসায়িক মালামাল বহন করার জন্য ৪০টি উট সব সময় ব্যবহার করতাম।
একদিন দূর দেশ হতে আমার চল্লিশটি উটে মালামাল বোঝাই করে স্বদেশে ফিরছিলাম। পথ চলতে চলতে আমি ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে গেলাম। তাই বিশ্রাম ও কিছু খাবার গ্রহণ করার জন্য একটি গাছের ছায়ায় চলে আসলাম। সেই গাছের অপর পাশে বসা ছিল আমি ফকির। (ভিক্ষুক নয় সন্ন্যাসীর মতো হয়ত) আমি তাকে খাওয়ার জন্য আহবান করলাম। এতে সে রাজী হল। দুজন মিলেমিশে খাওয়া-দাওয়া শেষে বিশ্রাম নিতে লাগলাম। তারপর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা চলতে লাগলো।
তার কথাগুলো আমার খুব ভালো লাগলো। কিছু সময়ের মধ্যে হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে তার সাথে আন্তরিক গড়ে উঠলো। সে তার ব্যক্তিজীবনের অনেক গোপনীয় কথা আমাকে বলতে লাগলো। মজার ব্যাপার ছিল আমরা যেখানে বসাছিলাম তার একটু দূরে ছিল এক পাহাড়। সে আমাকে বলল, "সামনের যে পাহাড়টি দেখতে পাচ্ছেন, ওই পাহাড়ে একটি গুহা আছে। আর তার ভিতরে রয়েছে অজস্র সম্পদ। এটার সন্ধান আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। এ কথা শুনে আমি খুশি হয়ে গেলাম।
গুপ্তধনের আশায় আমি তাকে গুহা থেকে কিছু সম্পদ আনার জন্য রাজি করালাম। তবে, তার সাথে আমার এই চুক্তি হলো যে আমার ৪০টি উটের মধ্যে বিশটি উটে সে গুপ্তধনের মালবোঝাই করবে আর বাকি বিশটি উটে আমি মালবোঝাই করে নিব। যেই ভাবনা সেই কাজ। সবগুলি উট নিয়ে আমরা অতি কষ্টে পাহাড়ের গুহায় পৌছালাম। সেখানে পৌঁছে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম। গুহার ভেতরে অজস্র মুল্যবান সম্পদ।
চুক্তি অনুযায়ী আমি ২০টি উটে মাল বোঝাই করতে লাগলাম এবং সেও তাই করতে লাগলো। হঠাৎ আমি একটি কৌটা লক্ষ করলাম। কিন্তু আমি এটার কোন গুরুত্ব দিলামনা। ভাবলাম সাধারণ একটি কৌটা এটা নিয়ে কি হবে! কিন্তু সে এটা দেখা মাত্রই তুলে নিয়ে বুকের ভিতর লুকিয়ে রাখলো। মালবোঝাই শেষে আমরা গুহা থেকে বেরিয়ে এলাম। তারপর অতি সতর্কতার সহিত আমরা পাহাড় থেকে নিচে চলে এসে পথ চলতে লাগলাম।
এত সম্পদ পেয়েও আমার মন ভরলো না। আমার তখন মনে হলো, আমি ঠকে যাচ্ছি। যেভাবেই হোক আমাকে সমস্ত সম্পদের মালিক হতে হবে। তাই আমি ফকিরটিকে বললাম, "ভাই! তুমি ফকির মানুষ হয়ে এত সম্পদ দিয়ে কি করবে। শুধু শুধু আরো ঝামেলা হবে। তাই ১০টি মাল বোঝাই উট আমাকে ফিরিয়ে দাও।
আমার কথা শুনে ফকিরটি হতাশ হলো না, মনও খারাপ করলো না। বরং সে খুশি মনে আমাকে দশটি ফিরিয়ে দিল। একটু পর আমি আবার তাকে বললাম, "ভাই তুমি তো সংসার ত্যাগী এক ফকির মানুষ। তোমার সম্পদের কি দরকার? তাই অবশিষ্ট ১০টি উটগুলিও আমাকে দিয়ে দাও। এবারও ফকিরের মন খারাপ হলো না বরং সে উৎফুল্ল চিত্তে আমাকে বাকি গুলো দিয়ে দিলো।
আমিতো খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলাম। তবে কিছুদিন যাওয়ার পর আমার মনে কৌতুহল জেগে উঠলো। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম, এতো কষ্টে সেই পাহাড় থেকে সম্পদ নিয়ে আসলাম। তার সম্পদ চাওয়া মাত্ৰই নির্দ্বিধায় সব সম্পদ আমাকে দিয়ে দিল। নিশ্চয়ই এর পিছনে কোন কারণ আছে। সেই কারণ আমি গভীরভাবে ভাবতে লাগলাম। তখন আমার মনে হলো ফকিরটি যে একটা কৌটা নিয়েছে নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোনো রহস্য আছে!
আমার মনে প্ৰবলভাবে সন্দেহ দেখা দিল। তাই আমি তাকে কৌটাটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। প্ৰথম থেকেই সে আমাকে খুব বিশ্বাস করত। তাই আমাকে বলল, "এই কৌটাটি খুবই মূল্যবান। কারণ কৌটাতে এক ধরনের মলম আছে যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এই মলম যদি ডান চোখে লাগানো হয় তবে মাটির নিচের কোথায় কি সম্পদ আছে সব স্পষ্ট দেখা যায়। আর যদি ভুলেও বাম চোখে লাগানো হয় তবে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি চলে যায়। আর কোন উপায়ে সেই দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা যায় না।
তার কথা আমার বিশ্বাসযোগ্য হলো না। তাই আমি সত্যতা পরীক্ষা করার জন্য তাকে আমার ডান চোখে একটু মলম লাগিয়ে দেওয়ার জন্য বললাম। তখন সে আমার ডান চোখে মলম লাগিয়ে দিলো। অতঃপর আমি নিচের দিকে তাকালাম। আমি স্পষ্টত মাটির নিচের সবকিছু দেখলাম। তখন আমার লোভ আরো বেড়ে গেল। অতি লোভে আমার জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়ে গেল। আমি ভাবলাম বাম চোখে মলম লাগালে হয়তো এর চেয়ে ভালো কিছু দেখতে পারবো যা সে গোপন রাখতে চাইছে।
তাই আমি তাকে আমার বাম চোখে মলম লাগিয়ে দিতে বললাম। কিন্তু সে রাজি হচ্ছিল না। কারন সে আমাকে বন্ধু ভাবে। তাই সে বলল যে আমার কোনো ক্ষতি সে চায় না। কিন্তু আমিতো নাছোড়বান্দা। আমি জোরজবস্তি করতে লাগলাম। তাই সে একপ্রকার বাধ্য হয়ে আমার বাম চোখে মলম লাগিয়ে দিল। আর সাথে সাথে আমার দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি চলে গেল। আমি অন্ধ হয়ে আফসোস করতে লাগলাম।
আর তখন সে আমার উপর বিরক্ত হয়ে বলল, "তুমি একজন লোভি এবং স্বার্থপর ব্যক্তি। তাই অতি লোভের ফলে তোমার এই সর্বনাশ হলো। এর জন্য তুমি নিজেই দায়ি। এ কথা বলে সে আমাকে একটি গাছের নিচে বসিয়ে দিল। তারপর সবগুলো উট নিয়ে চলে গেল। আমি আমার ভুলে অন্ধ হয়ে কান্না করতে লাগলাম।
এই বাগদাদ শহরের কিছু বণিক তখন সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা আমাকে চিনতে পেরে এই শহরে নিয়ে আসলো। এরপর থেকে আমার জীবন সংকীর্ণময় হয়ে উঠল। জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এল। আমার করুন অসহায় পরিণতির জন্য নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগলাম। তাই আমার কৃতকর্মের জন্যে এখনো অনুতপ্ত হই। পাপের শাস্তি ও পরকালীন মুক্তির জন্য নিজের কপালে আঘাত গ্রহণ করি। যাতে আমার পাপ ক্ষমার যোগ্য হয় আর এ থেকে সবাই শিক্ষা নেয়।
0 Comments