Bangla golpo: কাজীর সুক্ষ্ণ বিচার
বহুকাল আগের ঘটনা। এক অজপাড়া গায়ে বাস করতো এক ধনী কৃষক। তবে একসময় সে খুবই গরীব ছিল। সততা ও কঠোর পরিশ্ৰমের ফলে অনেক ধন-সম্পদের মালিক হয়। কৃষক হলেও সে ছিল একজন জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান। তাই গ্ৰামবাসীরা তাকে বুদ্ধিমান কৃষক বলে যথেষ্ট সম্নান-শ্ৰদ্ধা করতো।
সবকিছু থাকা সত্ত্বেও তার মনের সুখ ছিল না। তার অনেক বয়স হয়েছে। বাঁচে আর কয়দিন। কিন্তু তার তিনটি ছেলেই যে খুব সহজ সরল, বোকাসোকা। তিনি নিজে যেমন বুদ্ধিমান, উল্টো ছেলেগুলো তেমন বোকা। অল্পতেই ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া বেধে যায়। এদেরকে নিয়ে তার চিন্তার শেষ নেই। রাতে ঘুম নেই, ঠিকমতো খাওয়া নেই।
সারাদিন সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবেন। দুশ্চিন্তা করতে করতে একসময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অনেক চিকিৎসার পরও আরোগ্য লাভ তো হলোই না, উল্টো রোগ বেড়ে গেল।
বুদ্ধিমান কৃষক ভাবতে লাগলেন, আমার দিন তো ফুরিয়ে এলো। এখনই উপযুক্ত সময়। আমার যে পরিমাণ ধন-সম্পদ আছে তা তিন ছেলের মধ্যে ভাগ করে দিলে প্ৰত্যেকের ভাগে যথেষ্ট সম্পদ পড়বে। আর তারা পরিবার- পরিজন নিয়ে সুখে-শান্তিতে দিন কাটাতে পারবে।
তিনি ধন-সম্পদ গুলি ছেলেদেরকে লিখে দেওয়ার জন্য মনস্থ করলেন। যেই ভাবনা, সেই কাজ। তার এক বন্ধুকে উকিলের নিকট পাঠালেন। যথাসময়ে উকিল চলে এল। তিনি অছিয়ত নামায় লিখিত আকারে যাবতীয় সম্পত্তি তিন ছেলের মাঝে ভাগ করে দিলেন।
এর কিছু পর কৃষকটি মারা গেল। তিন ছেলে জমিজমার ভাগ নেওয়ার জন্যে অছিয়তনামা বের করলো। এতে লেখা রয়েছে আমার স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত ধন সম্পত্তি তিন ভাই সমান সমান পাবে। কিন্তু আমার ঘোড়াসালে যে কয়টি ঘোড়া আছে তার অৰ্ধেকটি পাবে বড় ছেলে, তিন ভাগের এক ভাগ পাবে মেজো ছেলে, আর মাত্ৰ নয় ভাগের একভাগ পাবে ছোট ছেলে।
জমিজমা, স্বৰ্ণালংকার, টাকা পয়সা খুব সহজেই ভাগাভাগি হয়ে গেল। এবার ঘোড়া ভাগ করে নেয়ার পালা। কিন্তু দেখা দিল বড় জটিল সমস্যা। ঘোড়াসালে সৰ্বমোট ঘোড়া ছিল ১৭টি। যা অছিয়ত নামা অনুসারে ভাগ সহজ ছিল না। অনেক চিন্তা-ভাবনা করেও কিছুতেই সঠিক হিসাব মেলাতে পারলো না।
অবশেষে তারা ব্যৰ্থতা স্বীকার করে গ্ৰামের বুদ্ধিমানদের শরণাপন্ন হলো। কিন্তু গ্ৰামবাসীরাও এর সঠিক হিসাব মেলাতে ব্যৰ্থ হলো। গ্ৰামের এক ব্যক্তি তাদেরকে কাযীর নিকটে যাওয়ার পরামৰ্শ দিল। কেননা এর সমাধান বিজ্ঞ কাযীর সুক্ষ্ণ জ্ঞান ছাড়া সমাধা সম্ভব নয়।
নিরুপায় তারা কাযীর দরবারে যেয়ে সমস্যার কথা জানালো। সব শুনে কাযী বলল, " শুনো পুত্ৰগণ, এভাবে তো সমস্যার সমাধান দেয়া যাচ্ছে না। আগামীকাল আমি নিজেই তোমাদের বাড়িতে যেয়ে এর সমাধান করে দিব। তোমরা নিশ্চিন্তে চলে যাও, আর আগামীকাল ঘোড়াগুলি বাইরে বের করে রাখবে"।
কাযীর কথায় আশ্বস্ত বাণী শুনে তারা একটু স্বস্তি পেল। পরদিন কথামতো বিজ্ঞ কাযী ঘোড়ায় চড়ে তাদের বাড়িতে গেলেন। তারপর কৃষকের অছিয়ত নামা সবাইকে পড়ে শুনালেন। এবার ঘোড়ার সঠিক ভাগ করার পালা। কাযী বলল, "শুনো পুত্ৰগণ, তোমাদের আছে ১৭টি ঘোড়া আর আমি দিলাম ১টি ঘোড়া। এখন ঘোড়ার সংখ্যা দাঁড়াল ১৮টি।
এখন শৰ্ত অনুযায়ী, বড় ছেলে পাবে অৰ্ধেকটি ঘোড়া অৰ্থাৎ সে পাচ্ছে ৯টি ঘোড়া। এরপর মেজো ছেলে পাবে ৩ ভাগের এক ভাগ, অৰ্থাৎ সে পাচ্ছে ৬টি ঘোড়া। আর বাকী থাকলো ছোট ছেলে, সে পাবে নয় ভাগের একভাগ। এখন ১৮টি ঘোড়াকে ৯ ভাগ করলে প্ৰতি ভাগে পড়ে ২টি ঘোড়া। তাই সে পাচ্ছে ২টি ঘোড়া।
এখন ভাগকৃত ঘোড়ার সংখ্যা দাড়াঁল বড় ছেলে ৯টি + মেজো ছেলে ৬টি + ছোট ছেলে ২টি = ১৭টি। বাকী থাকলো ১টি ঘোড়া। আমারটি আমি নিয়ে নিলাম।
হিসাব মিলে গেল। কাযীর এমন সুক্ষ্ণ বিচার উপস্থিত সবাই সমৰ্থন করল। বিজ্ঞ কাযী এমন জটিল হিসাব কত সুক্ষ্ণ ভাবে মেললেন সত্যিই প্ৰশংসার যোগ্য।
0 Comments