ন্যায়বিচারক, মহানশাসক উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটি ঘটনা


আমর ইবনুল আস (রা) ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রিয় একজন সাহাবী। তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন।

তাঁর জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিচক্ষনতা ছিল সবার চেয়ে আলাদা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন যে হুকুম দিতেন তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তা পালন করতেন।

মেধা ও যোগ্যতার দ্বারা তিনি দেশজুড়ে সুনাম ও পরিচিতি লাভ করেছিলেন।

হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু যখন খলিফা হিসাবে নির্বাচিত হলেন তখন আমর ইবনুল আসকে (রা) মিশরের বাদশাহ (গভৰ্নর) নিযুক্ত করেন।

বাদশাহ হিসাবে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতেন। মনে কখনও অহংকার, গর্ব ছিল না।

কিন্তু তার ছেলে আব্দুল্লাহ ছিল একটু অহংকারী টাইপের। পিতা হলো মিশরের বাদশা, তাই সব সময় ভাব নিয়ে চলত। কাউকে পরোয়া করত না, অন্যকে খোঁচা দিয়ে কথা বলা, অহেতুক ঝগড়া-বিবাদ করত। 

দিনে দিনে তার অহংকার বাড়তে লাগলো।

একসময় তা সীমা ছাড়িয়ে গেল। 

তৎকালীন সময়ে কিবতী সম্প্রদায়ের লোকেরা ছিল ক্রীতদাসের মত।

অন্য সম্প্রদায়ের লোকেরা কিবতীদের ঘৃণার চোখে দেখত। তাদের সাথে মেলামেশা বা বন্ধুত্ব করতে চাইত না। কেননা তারা ছিল নিম্ন শ্ৰেণীর।

একদিন বাদশাহ পুত্র আব্দুল্লাহ  এক কিবতীর সাথে তর্কে লাপ্ত হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে আব্দুল্লাহ গর্বের বসে কিবতীকে অন্যায়ভাবে মারধোর, নির্যাতন করলো।

এ খবর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। খলিফা ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর কানেও এসে পৌঁছালো। 

তিনি বাদশাহ পুত্ৰ আব্দুল্লাহর এমন কান্ডে খুব মর্মাহত হলেন। মনের বেশ দুঃখ পেলেন।

মহান আল্লাহ তা'আলার নিকট সকল মানুষ সমান।

মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। মানুষের মাঝে ছোট বড় বলে কেউ নেই।

দুনিয়াতে সবাই তো সমান। কেউ কারো ক্রীতদাস নয়, আবার কেউ কারো প্রভু নয়।

আব্দুল্লাহ সাধারণ এক কীর্তির সাথে যে অন্যায় আচরণ করেছে তা তিনি মেনে নিলেন না।

তিনি মানুষের মাঝে এ ধরনের ঘৃণ্য ও আভিজাত্য অহংকার ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে চাইলেন। বাদশাহর পুত্র বলে কোন ছাড় দেয়া হবে না।

তিনি এর যথাযথ বিচার করবেন বলে জানিয়ে দিলেন।

দেশের সর্বত্র খবর পৌঁছে দেয়া হলো। বিচারের দিনক্ষণ ঠিক করা হলো।

বিচারের দিন উপস্থিত হলো আমর ইবনুল (রা) ও তার পুত্র আব্দুল্লাহ। উপস্থিত হলেন অত্যাচারিত সেই কিবতী।

বিচার হবে জনসম্মুক্ষে, দেশের সকল মানুষের সামনে।

লোকজন দলে দলে আসতে লাগল  বিচারসভায়। কি হতে চলছে! বাদশাহর পুত্ৰের বিচার করবে খলিফা নিজে। সবাই বিচার দেখার জন্য কৌতুহল হয়ে পড়ল। 

যথাসময়ে বিচারকাৰ্য শুরু হলো। খলিফা উমার (রা) নিজেই হলেন বিচারক।

তিনি প্ৰথমে কিবতীকে পুরো ঘটনা বলতে বললেন। আদেশ পেয়ে কিবতী সমস্ত ঘটনা খুলে বলল এবং সাক্ষীও পেশ করল।

সাক্ষ্য প্ৰমাণিত হলো। উমার (রা) দেখলেন সত্যিই কিবতীকে অন্যায় ভাবে অত্যাচার করা হয়েছে।

এবার বিচারের রায়ের পালা। ওমর (রা) কিবতীকে বললেন, "আব্দুল্লাহ তোমাকে যতগুলো আঘাত করেছে, তুমিও তত জোরে তাকে ততগুলো আঘাত করো"।

কিবতী ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর কথা শুনে হয়ে বিস্মিত হয়ে গেল। সে ভাবতে পারছেনা খলিফা এমন আদেশ দেবেন।

তবে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে ন্যায় বিচার পেয়ে সে খুব খুশি হলো এমন বিচারে তার মনটা ভরে গেল।

বাদশাহর পুত্ৰ আব্দুল্লাহকে সে আঘাত করবে, পড়ে যদি আব্দুল্লাহ এর প্রতিশোধ নেয় তখন কি হবে!

এ কথা চিন্তা করে কিবতীর  হাত-পা কাঁপতে লাগল। তাই সে ভয়েই আব্দুল্লাহকে আঘাত করতে ইচ্ছা পোষণ করলো না।

কিন্তু ওমর (রা) কিবতীর ভয় পাওয়াকে সমৰ্থন করলেন না।

তিনি কিবতীকে অভয় দিয়ে বললেন, "এটা খলিফার রায়। আ র অবশ্যই পালন করতে হবে। ভয় পেয়ো না, তোমার কোন ভয় নেই। নির্ভয় খলিফার আদেশ পালন করো।

উমার (রা) কথা শুনে সে একটু একটু চাঙ্গা হয়ে উঠল। তারপর  সাহস সঞ্চার করে হাতে একটা বেত তুলে নিয়ে এগিয়ে গেল আব্দুল্লাহর দিকে।

উপস্থিত সকলেই হতবম্ভ। তারা খলিফার নিকটে এমন বিচারই আশা করেছিল। তাই শুধু বিচার এর কর্মকান্ড দেখে যাচ্ছে। শুধু পিনপতন নীরবতা চলছে।

এদিকে অপরাধী আব্দুল্লাহ মারের ভয়ে কাঁপছে।

আজকে যে তারা আর বাঁচার কোন উপায় নেই। অন্যায়ের  শাস্তি পেতেই হবে। এসব ভাবছে সে।

কিবতী ততক্ষণে তার শরীরে আঘাত করা শুরু করে দিয়েছে। সাধ্যমত আঘাত করলো। আঘাতে আঘাতে শরীর রক্তে জর্জরিত হয়ে গেল।

এভাবেই ইসলাম জাহানের দ্বিতীয় খলিফা ও পৃথিবীর ইতিহাসে  সর্বশ্রেষ্ঠ মহাশাসক হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু আব্দুল্লাহর গর্ব, অহংকার অভিজাত্যকে ধুলোর সাথে মিশিয়ে দিলেন।

আব্দুল্লাহ যে একজন বাদশার পুত্ৰ এর কোন মূল্যই দিলেন না তিনি।


সাহাবীদের জীবনী গল্প পড়তে নিচের লিংকগুলোতে ক্লিক করুন

১ দুই মুসাফির = আট দিরহাম

২ অত্যাচারী বাদশা ও ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর ঘটনা

৩ হযরত আবু বক্কর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর কয়েকটি ঘটনা

৪ আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর মায়ের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের একটি ঘটনা

৫ হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ও কাজী সুরাইহার একটি বিচার

৬ ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ও তার সৎ পুত্রবধূর একটি ঘটনা

৭ ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর ইসলাম গ্রহণ মানেই মুসলমানদের বিজয় যাত্রা

৮ ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু কে যে চারটি প্রশ্ন করেছিল খ্রিস্টান বাদশাহ

 ৯ হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর ন্যায়বিচারের ঘটনা

Post a Comment

0 Comments