মায়ের সোনার হার পড়ার খুব শখ ছিল। কিন্তু শখকে বাস্তবে রূপদানের আগেই স্বামী মারা গেল। তাই মা ছেলের নিকটে ইশারা-ইঙ্গিতে শখের কথা ব্যক্ত করলো। মায়ের কথা বুঝতে পেরে পরদিন ছেলে হার নিয়ে বাড়ি ফিরল। এতে মা খুব খুশি হলো। এভাবে আরো কিছু দিন কেটে গেলো।
একদিন মেজ ছেলের বউ শ্বাশুরীকে বলল, "মা, আমরা চাই আপনি সারা জিবন আমাদের সাথে থাকুন। কিন্তু জানেনই তো মা, আপনার ছেলে খুব একটা আয়-রোজগার করতে পারে না। আর আমরা আপনাকে তেমন আদর-যত্ন করতে পারছি না। তাই বলছিলাম কি মা, আপনার ধন-সম্পদ সবটুকু যদি আমাদের নামে লিখে দিতেন তাহলে আমরা আপনাকে অনেক অনেক আদর-যত্নে রাখতে পারতাম"।
বউমার কথা শুনে মা একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন। ভাবতে লাগলেন, নাহ্, বউমা তো ঠিক কথাই বলেছে। বড় ছেলে, ছোট ছেলে ও তার বউয়েরা তো আমাকে তেমন ভালোবাসে না, খোজ খবরও তেমন নেয় না। তাহলে তাদের ধন-সম্পদ দিয়ে কি করব। আমি বুড়ো মানুষ। আর হয়ত বেশিদিন বেঁচে থাকবো না।
তাই তিনি মেজ ছেলের উপর সন্তুষ্ট থেকে লিখে দিলেন তার সব ধন-সম্পত্তি। মানব চরিত্র বোঝা খুবই রহস্যজনক, জটিল ও দুর্বোধ্য। বোঝা বড় দায় কে লোভী, কে স্বার্থপর, কেইবা সৎ, নির্লোভ। যাকে অতি সৎ মনে করা হয়, সেই হয়ত মুখোশ পড়া রয়েছে। পরে এমন অপকর্ম করে বসে, যার ফলে মুখোশ ভেদ করে তার আসল রুপ বেরিয়ে আসে।
সবার মুখোশ উন্মোচিত হলো। মা প্রতিরাতে সোনার হারটি বালিশের পাশে রেখে ঘুমান। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হারটি দেখতে পেলেন না। সারা ঘর তন্ন তন্ন করে খুজলেন কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না। তিনি ভাবতে লাগলেন, মেজ বউ ছাড়া তো কেউ আমার ঘরে আসে না। তাহলে হয়ত মেজ বউ পড়ার জন্য নিয়েছে। তিনি বিষয়টি খুব সহজভাবে নিয়ে মেজ বউকে ডাকতে লাগলেন।
ডাক শুনে বউমা ঘরে এলে মা কোমল সুরে জিজ্ঞাসা করলেন, " বউমা আমার সোনার হারটি খুজে পাচ্ছি না। তুমি কি এটি নিয়েছো"। একথা শুনে বউ তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো। সে ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো, "মানে কি মা! আপনি বলতে চাচ্ছেন, আমি হারটি চুরি করেছি। মা বললেন, না বউমা আমি তা বলছি না। বউমা বললো, "আপনি কি বোঝাতে চেয়েছেন তা ভালোই বুঝতে পেরেছি"।
এভাবে এককথা দুইকথা বলতে বলতে একসময় তর্ক তারপর ঝগড়া লেগে গেল। মেজ ছেলে অনেক চেষ্টা করেও তাদের ঝগড়া-ঝাটি থামাতে ব্যর্থ হচ্ছে। কেননা সেও বার বার স্ত্রীর পক্ষে কথা বলছিলো। মা মনে খুব কষ্ট পেলেন। ছেলে ও তার বউয়ের সাথে না পেরে এক পর্যায়ে বললেন, "তোমরা যদি হারটি না সরাও তাহলে কি এটা উড়ে চলে গেল?
ওওও, আমি এখন বুঝতে পারছি তোমার ধন-সম্পত্তির লোভে আমাকে এত আদর-যত্ন করেছো, সোনার হার বানিয়ে দিয়েছো। আজ সবকিছু পেয়ে আমার সাথে এমন করছো, তাই না? আমি আর তোমাদের মত লোভি-স্বার্থপরদের সাথে থাকব না। আমার ধন-সম্পদ ফিরিয়ে দাও আমি চলে যাব। একথা বলে মা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
তখন মেজ ছেলে তার স্ত্রীকে বললো, নাহ মায়ের সাথে এমন করাটা ঠিক হলো না। তিনি অনেক কষ্ট পেয়েছেন। তোমার কথা শুনে বড় ভুল করলাম"। বউ বললো, আরে আস্তে কথা বলো, লোকে শুনতে পাবে। সুখে থাকতে চাইলে একটু অভিনয় তো করতেই হবে নাকি?
এদিকে মা বড় ছেলের বাড়িতে চলে গেলেন। খুব অনুনয় -বিনয়ের সুরে তাদের বললেন, "বাবা জানস, আমার মেজো ছেলে ও তার বউ খুব খারাপ। তাই আমি আর ওদের সাথে থাকবো না। তর বাড়িতে থাকতে আমারে থাকতে দে। আমি ঘরের এক কোণে পড়ে থাকব। তোরা যা খেতে দিবি তাই খাব। যা পড়াবি তাই পড়ব কখনও অভিযোগ করব না।
একথা শুনে বড় ছেলে ও তার বউ একসাথে বলে উঠলো, "তোমার সব ধন-সম্পত্তি মেজ ছেলেকে দিয়ে এখন আমার ঘারে চাপতে চাও। না, তাতো হবে না। আমরা তোমার কোনো দায়িত্ব নিতে পারবো না। তুমি চলে যাও"। হতাশ হয়ে কাঁদতে কাঁদতে মা ছোট ছেলের বাড়িতে গেলেন।
ছোট ছেলেকে তার দুঃখের কথা বললেন এবং থাকার জন্য সামান্য একটু আশ্রয় চাইলেন। সব শুনে ছোট ছেলে ও তার বউ কটু কথা শুনিয়ে দিল এবং চলে যেতে বললো। নিরুপায় হয়ে মা চললেন এবার একমাত্র মেয়ের বাড়ি। এটাই শেষ ভরসাস্থল। সেখানে যেয়ে মেয়ে ও তার জামাইকে সব বললেন। তারাও আশ্রয় না দিয়ে রুঢ় ব্যবহার করলো।
এবার মায়ের কান্না দেখে কে! তিনি ভাবতে লাগলেন, এবার কি হবে আমার! কোথায় এখন আশ্রয় নিবো? একসময় কান্না করতে করতে অজানা গন্তব্যের দিকে হাঁটতে লাগলেন। এই মুহূর্তে ভিক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। যা ভাবনা তাই কাজ। থালা হাতে নিয়ে বসে পড়লেন রাস্তার ধারে। এভাবে কয়েকদিন চলে গেল।
একদিন ভিক্ষা করার সময়ে তিনি পরিচিত 'চাচি' ডাক শুনতে পেলেন। তিনি চোখমেলে দেখলেন সন্তানতুল্য করিম তাকে ডাকছে। করিমকে পেয়ে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। এই করিম প্রায় ১৫ বছর তার বাড়িতে ছিল। মা-বাবা এতিম অসহায় করিমকে নিজের অন্য ছেলেদের মতোই আদর স্নেহে বড় ও লেখাপড়া করিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
করিম তাই নিজের মা-বাবার মতোই মতোই চাচা-চাচিকে ভালোবাসতো, সম্নান-শ্রদ্ধা করতো। তবে কোম্পানির কাজের জন্য করিম এতদিন দেশের বাইরে ছিল। তাই চাচির খোজ-খবর নিতে পারে নি। আজ দেশে এসে চাচির এই অবস্থা দেখে খুব কষ্ট পেল।
তার শহরের একটি বাসায় চাচিকে নিয়ে গেল। তারপর চাচির এই করুন অবস্থা শুনলো। করিম সাহেব তাকে সাচ্ছন্দে আজীবন তাকে এবাসায় থাকতে বললো। এ বাড়িতে তিনি খুব আদর- যত্নে থাকতে লাগলেন। কিন্তু শেষ বয়সে নিজের ছেলে-মেয়েদের দেখতে না পেয়ে মায়ের মন সব সময় বিষন্ন থাকতো। করিম সাহেব বিষয়টি বুঝতে পারলো এবং চাচির মুখে হাসি ফুটানোর জন্য একটি প্লান করে ফেলল।
করিম সাহেব একটি ব্যাগে অজস্র টাকা ও স্বর্ণালংকার ভরে চাচিকে নিয়ে চললো গ্রামের বাড়িতে। তারপর চাচির তিন ছেলেকে ডেকে একত্র করলো। তারপর সবার উদ্দেশ্য বললো, " ভাই তোমরা জানো, আজ আমি সমাজে প্রতিষ্ঠিত। টাকা-পয়সা, গাড়ি-বাড়ি কোনো কিছুর আমার অভাব নেই। কিন্তু আমার এসব কিছু হয়েছে চাচা-চাচির জন্য। তারা আমাকে সন্তানস্নেহে বড় করেছেন। আজ চাচা বেঁচে নেই। কিন্তু আমার চাচিও আজ বৃদ্ধা হয়ে গেছেন।
তারপর করিম সাহেব ব্যাগের চেন খুলে সবার সামনে রেখে বললেন, "। আমি চাই চাচি জীবনের শেষ কয়েকটা দিন খুব আরাম- আয়েশে থাকুক। তোমরা সবাই দেখ এই ব্যাগে অজস্র টাকা ও স্বর্ণালংকার রয়েছে। এগুলো আমি চাচির নামে ব্যাংকে রেখে দেব। আপনাদের মধ্যে যারা চাচির বেশি সেবা-যত্ন করবে আমি ও চাচি তাদেরকে এই টাকার চেক তুলে দিবো।
করিম সাহেবের কথা সবাই খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিল। এত টাকা, স্বর্ণালংকার দেখে তারা লোভে পড়ে গেল। এখন সবাই মাকে ঘরে নেওয়ার জন্য খুব আগ্রহ প্রকাশ করলো। সবার আগ্রহ দেখে করিম সাহেব বললেন, " কোনো সমস্যা নেই। আপনারা সবাই একমাস করে চাচিকে রাখবেন। তারপর অন্য ছেলের ঘর। মনে রাখবেন, আদর যত্ন যে বেশি করবে তার হাতেই এই সম্পদের চেক উঠবে।
সেই দিন থেকে চাচি সবার ঘরে খুব আদর-যত্নে থাকলো। পরম সুখে দিন কাটলো। একসময় চাচি মৃত্যুবরণ করলো। এবার সবাই করিম সাহেবের নিকট চেক নিতে গেলো। কিন্তু করিম সাহেবের বাসার গেইটে তালা দেখতে পেল। খবর নিয়ে জানতে পারলো যে কিছুদিন আগে করিম সাহেব বউ পোলাপান নিয়ে বিদেশ চলে গেছেন। আসলে করিম সাহেব চাচির দুঃখ দুর ও তার ছেলেদের শাস্তি দেওয়ার জন্য এরূপ করেছিল। করিম সাহেব জানতো তারা টাকার লোভে চাচিকে সর্বোচ্চ সেবা যত্ন করবে।
এদিকে টাকার শোকে তারা পাথর। একসময় নিজেদের ভুল বুঝতে পারলো। সত্যিই মায়ের সাথে গর্হীত আচরণ করা হয়েছে। তবে শেষের দিকে সম্পদের লোভে তারা ভালই আচরণ করেছে যা পুর্বেই করা উচিত ছিল। মায়ের প্রতি এরূপ অন্যায় আচরন করায় তারা খুব অনুতপ্ত হলো। মৃত্যু পর্যন্ত সকলে মহান আল্লাহর নিকট মাফ চাইতে লাগলো।
0 Comments