Islamic motivational real story
ঘটনা 1
আরব মরুভূমি। চারদিকে শুধু বালি আর বালি। মরুভূমির পথে হেটে যাচ্ছে এক বাণিজ্য কাফেলা। যাত্ৰা তাদের আপন বাড়িতে ফেরা। দীর্ঘদিন শহরের বুকে ব্যবসা-বাণিজ্য শেষে ফিরছে। সবার কাছেই আছে নগদ টাকা-পয়সা ও মুল্যবান সামগ্ৰী। এজন্য তারা খুব সচেতনার সাথে এগুচ্ছে। কারণ মরুভূমির এপথ খুব বিপদজনক। কখন আবার ডাকাত দল হানা দেয়। ভয়ে আতঙ্কে রয়েছে সবাই।
বাংলায় একটা কথায় আছে: যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধ্যা হয়। বাতাসে ভেসে এলো একদল ডাকাতের কণ্ঠস্বর। কি হবে এবার! বাচার তো কোন উপায় নেই। এই তো গেল! গেল তাদের সৰ্বস্ব। আতঙ্কে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল সবার।
কাফেলায় এক বণিক ছিল খুব সম্পদশালী। তার নিকটে আছে অজস্র টাকা কড়ি। এত কষ্টের টাকা, ধরা পড়লে সব লুট করে নিবে। যেভাবেই হোক টাকাগুলি গচ্ছা যেতে দিবে না।
সে কাফেলা থেকে কেটে পড়ল। টাকাগুলি হেফাজতে রাখার জন্য নিরাপদ স্থান খুঁজতে লাগলো। এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করল। ভালো কোন স্থান পাওয়া যাচ্ছিল না।
কিছুক্ষণ পর নজরে পড়ল একটি তাবু। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সেখানে। ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখল এক ব্যক্তি খুব মনোযোগ সহকারে নামাজ পড়তেছে। লোকটির শরীরের দিকে লক্ষ্য করল। দেখল গায়ে চটের পোশাক। গলায় মোটা জপমালা।
বনিকটি মনে মনে ভাবত লাগল, আরে এতো দরবেশ! যাক ভালোই হলো। সঠিক জায়গায় তাহলে এসেই। এই দরবেশ ব্যক্তিই পারবে তার টাকা হেফাজতে রাখতে। আল্লাহ সহায় হোক। বেজায় খুশি হলো বণিকটি।
ততক্ষনে দরবেশের নামাজ পরা শেষ। এবার তসবিহ নিয়ে পাঠ করতে লাগল। বুক ভরা আশা নিয়ে ভেতরে ঢুকলো বণিক। তার সাথে কুশল বিনিময় করে আসন্ন বিপদের কথা জানালো।
বণিকের কথায় ব্যথিত হলেন দরবেশ। অভয় দিল বণিককে। টাকাগুলি নিরাপদ স্থানে রাখার জায়গা দেখিয়ে দিল। টাকা গুলি রেখে বাইরে চলে গেলো। কাফেলার একটু দুরে পালিয়ে রইল।
ওদিকে ডাকাতরা লুটতরাজ শেষে উধাও হয়ে গেল। সৰ্বস্ব হারিয়ে হায় হায় করতে লাগল সবাই। বণিক কিন্তু অখুশি হলো না। এবার সে নিশ্চিন্ত হলো। ডাকাত তো চলেই গেছে। তাই টাকাগুলি ফেরত আনতে গেল সেই তাবুতে। গেল সেখানে; যেখানে দরবেশরুপী এক মহান ব্যক্তি রয়েছে। মনে মনে সে দরবেশের প্ৰতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করল।
এবার সে সরাসরি তাবুর ভেতরে ঢুকে যা দেখল তাতে তার মাথা ঘুরতে লাগল। একি কি দেখছি, হায়! মরি তাজ্জব বনে যাই। পায়ের তলার বালি সরে গেল তার। এখন দরবেশ শুধু একা নন, সাথে আছে তার সাথীদের মাল-পয়সা লুট করা সেই ডাকাতগুলিও। লুট কৃত মাল-পয়সা ভাগ ভাটোয়ারা করতে ব্যস্ত তারা।
আর ডাকাতগুলি এই দরবেশকে উস্তাদ বলে সম্বোধন করছিল। বুঝতে বাকি রইল না বণিকের। এই দরবেশ তাহলে ছদ্নবেশধারী ডাকাত সৰ্দার। দরবেশ সেজে বিশ্বস্ত লোকদের ধোকা দেন তাহলে। বণিকটি এসব ভাবতে লাগল।
তখন এক ডাকাত বণিককে দেখে ফেলল। দরবেশরুপী ডাকাত সৰ্দার বলল, তুমি এখানে কেন এসেছো। বণিকটি একটু সাহস সঞ্চার করে বলল, আপনার নিকট যে টাকা গুলি রেখে গিয়েছিলাম তা ফেরত নিতে এসেছি।
সে বলল, 'তো তোমার টাকা তুমি নিয়ে যাও। বণিকটি যেখানে টাকা রেখেছিল সেখানে গেল। দেখল তার টাকা যেভাবে রেখে গিয়েছিল ঠিক সেভাবে পড়ে রয়েছে। যাক তাহলে তার টাকা গচ্ছায় যায় নি। টাকাগুলো তুলি নিয়ে সে তৎক্ষনাৎ কেটে পড়ল। কিন্তু ডাকাতরা সৰ্দারের এমন কান্ডে অসন্তুষ্ট হলো। টাকা ফেরত দিতে অনিচ্ছুক ছিল তারা।
তখন দরবেশরুপী ডাকাত সৰ্দার বলল, 'এটা তোমরা বুঝতে পারছো না ? আমার প্ৰতি লোকটির ধারণা ছিল ভালো। সে আমার প্ৰতি বিশ্বস্ত ও নিৰ্ভরশীল ছিল। যেমনটা আমরা সৃষ্টিকৰ্তার প্ৰতি বিশ্বাস ও নিৰ্ভরশীলতা অবলম্বন করি।
তাই লোকটির ভালো ধারণাকে সত্যে পরিণত করলাম। আমি আমাণতের খেয়ানত করলাম না। আমি আশা রাখি, মহান আল্লাহ অনুগ্ৰহ করে আমার ভালো ধারণাকে সত্যে পরিণত করবেন।
ওদিকে বণিকটি পথ চলতেছে লাগল। এমন পরিস্থিতিতে সে হতবিহ্বল হয়ে গিয়েছিল। সে ভাবতে লাগল, 'এটা কি ভাবে সম্ভব হতে পারে? দরবেশ আবার ডাকাত সৰ্দার হয় কি করে! যাই হোক, টাকা গুলি তো গচ্ছা গেল না। খুব খুশি।
সে ডাকাত সৰ্দারকে ধন্যবাদ জানাল। আর তার জন্য এরূপ দোয়া করল, 'হে আল্লাহ তুমি দরবেশরূপী ডাকাতকে কবুল করে নাও। আর তাকে সত্যি কারের দরবেশ বানিয়ে দাও। তার দ্বারা যেন ইসলামের খেদমত হয়।
আর একটি ঘটনা
কিছুদিন পর আর একটি বাণিজ্য কাফেলা সেই ডাকাতদের কবলে পড়ল। হীন্য পরিস্থিতিতে এক ব্যক্তি ডাকাত সৰ্দারের সাথে দেখা করতে চাইল।
লোকটি বলল, ' আমাকে আপনাদের সৰ্দারের নিকট নিয়ে চলুন।
এক ডাকাত বলল, ' তিনি এখন ব্যস্ত আছেন। তাই দেখা করতে পারবেন না।
: কিসের জন্য ব্যস্ত আছেন? তিনি এখন কোথায়।
: তিনি এখন নদীর তীরে নামাজ পড়তেছেন।
: এখন তো নামাজের সময় না।
: তিনি নফল নামাজ পড়তেছেন।
: তিনি দুপুরে খাবেন কখন?
: তিনি দিনে খান না, পান করেন না।
: কেন খান না
: তিনি দিনের বেলা রোজা রাখেন।
: কিন্তু এখন তো রমজান মাস নয়।
: তিনি নফল রোজা রাখেন।
তখন লোকটি বলল, ' যাই কিছু হোক আমাকে নিয়ে চলুন তার নিকটে। তখন ডাকাতরা এক প্ৰকার বাধ্য হয়ে লোকটিকে নিয়ে গেল। লোকটি ডাকাত সৰ্দারকে দেখে জিঙ্গাসা করল, 'আপনি একদিকে ডাকাতি করছেন, আবার ইসলামের যাবতীয় বিধি বিধান মেনে চলছেন ; বিষয়টি কি রকম অদ্ভুদ না'? ডাকাতির সাথে নামাজ/পালনের উদ্দেশ্যটা কি?
ডাকাত সৰ্দার তখন একটি কোরআনের আয়াত পাঠ করে শোনালেন। এভাবে বলা আছে, 'দ্বিতীয় দল নিজেদের পাপসমূহকে স্বীকার করল এবং পূণ্য কাজগুলোকে তার সঙ্গে মিশিয়ে দিল।
এমন কথা শুনে লোকটি টাস্কি খেয়ে গেল। খাওয়ারই তো কথা। অন্তরে কত খোদাভীতি, অথচ বাইরে একজন ডাকাত নেতা। একজন ছদ্নবেশী দরবেশ ও ডাকাত।
এতোক্ষন ধরে ছদ্নবেশধারী যে ডাকাত নেতার কথা আলোচনা করছিলাম, তিনি হলেন হযরত ফোজায়েল ইবনে আইয়াজ (র)।
যিনি পরবৰ্তী সময়ে ইসলামের এক কালজয়ী সুফি সাধক হয়ে উঠেন। যার সংস্পৰ্শে এসে লক্ষ্য লক্ষ্য পথভ্ৰষ্ঠ মানুষ হেদায়েত প্ৰাপ্ত হয়েছিল। এককথায় তিনি ছিলেন উচ্চ পর্যায়ের একজন আল্লাহর ওলী।
প্ৰথম জীবনে তিনি ছিলেন ডাকাত সৰ্দার। তবে ডাকাতি জীবনেও তার ভাল কিছু বৈশিষ্ট ছিল। যেগুলি তার কৰ্মিরা মেনে চলত। যেমন :
আক্ৰমণকৃত কোনো কাফেলায় মেয়ে লোক থাকলে তার কোনরুপ ক্ষতি করা যাবে না।
কারও কাছে সামান্য মাল-পয়সা থাকলে তা লুট করা যাবে না।
আবার লোকদের সৰ্বস্ব লুট না করে একটা অংশ তাদের ফিরিয়ে দেওয়া ইত্যাদি।
তার জীবনী পড়ে আরো জানা যায় যে, প্ৰথম জীবনে তিনি এক মেয়ের প্ৰেমে পড়েছিলেন। মেয়েটির জন্য খুব দেওয়ানা ছিলেন তিনি। মেয়েটির ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ডাকাতি মালের সব টুকু তাকে দিয়ে দিত। মাঝে মাঝে তার নিকটে এসে কান্নাকাটি করতেন।
এক বিস্ময়কর বিচিত্ৰ চরিত্ৰের মানুষ ছিলেন তিনি।
আল্লাহ পাকের অপার মহিমা বোঝার সাধ্য নেই। তার লীলাখেলা বোঝা বড় দায়। আল্লাহপাকের মেহেরবানীতে তিনি হেদায়েত প্রাপ্ত হলেন। আচমকা পরিবর্তন হলো তার কর্মকাণ্ডে। মন-মানসিকতায় ও চিন্তাভাবনায়।
ঘটনা 3,
এক রাতে তিনি তাঁবুতে বসা ছিলেন। তখন একজন কাফেলা যাত্রীর মুখ থেকে শুনতে পেলেন পবিত্র কোরআনের একটি বাণী, 'এখন কি আল্লাহর স্মরণ দ্বারা ঈমানদারদের হৃদয় সমূহকে ভীত ও জাগরিত করার সময় আসেনি? কথাগুলি তীরের মত ছুটে গিয়ে বুকে বিধল তার। অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল।
ভেতর থেকে কে যেন বলতে লাগল, ' হে দুরাত্না! এভাবে আর কতদিন চলবি। আর কত মানুষের ধন-সম্পদ লুটপাট করবি? তোর পাপ তো এবার সীমা অতিক্রম করেছে। যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। এবার তওবা করার সময় এসে গেছে।
অন্তরের আহ্বানে এবার সাড়া দিলেন। শুরু হলো ছটফঠানি। সেতো অন্ধকার থেকে আলোর পথে আসার জন্য। সবকিছু বিতৃ লাগতে শুরু করলো। সত্যিই তো আর কতো! এখন তো একটু আলো দরকার। যে আলোয় আলোকিত হবে জীবনের বাকী পথ-সমূহ।
ঘটনা 4,
এই পথ দিয়েই যাচ্ছিল এক দল কাফেলা। পথ পাড়ি দিতে খুব ভয় পাচ্ছিল। একে অপরকে বলতে লাগল, 'এ পথ দিয়ে যাওয়া মোটেই ঠিক হচ্ছে না। এ পথেই তো আছে ডাকাতদের আস্তানা। আছে তাদের সৰ্দার ফোজায়েল এর তাবু। এই মনে হচ্ছে টাকাকুড়িঁ সব লুট করে নিবে।
কথাগুলি ইবনে আয়াজ (র) তাবুর ভেতর থেকে শুনতেছিল।তিনি তার পূৰ্বের কৃতকৰ্মের অনুশোচনা করতে লাগল। তিনি বললেন, ' ওহে কাফেলা দল! তোমাদের আর কোনো ভয় নেই। সবার নিকট সুসংবাদ পৌছে দাও যে ডাকাত নেতা ইবনে আয়াজ এর পরিবৰ্তন ঘটেছে। তার জীবনধারা পাল্টে গেছে। সে তো দিন-রাত তওবা করতেই ব্যস্ত'।
আল্লাহর ভয়ে তার ভেতরে কম্পন শুরু হয়ে গেল। তিনি আর সেখানে থাকতে পারলেন না। সবকিছু রেখে দৌড়ে পালিয়ে গেলেন। ডাকাতি জীবনের অন্তরালে সব ঝেড়ে ফেললেন।
তার এমন কথাবাৰ্তা ও কৰ্মকান্ডে কাফেলা দল অবাক। অবাক হওয়াই তো স্বাভাবিক। যার ভয়ে সবাই ভীত-সন্তুষ্ট থাকে, আজ তিনি ভীত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন।
(আজ এ পর্যন্তই থাক। ইনশাআল্লাহ বাকি ঘটনাসমূহ আমরা পর্যায়ক্রমে আলোচনা করব)
0 Comments