বনি ইসরাইলের একটি ঘটনা। এক গ্রামে বারসিসা নামে এক যুবক বাস করত। সে একত্ববাদী খোদায় ঈমান এনেছিল এবং মনে প্রাণে এটা বিশ্বাস করতো যে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর একজন নবী ও রাসূল। তাই আমরা তাকে ঈসা আলাইহিস সালাম এর উম্মত বলতে পারি। সে তার নবীর আদর্শে আদর্শিত হওয়ার জন্য সর্বদা চেষ্টা করত। তাই প্রথম অবস্থায় সে ছিল অত্যন্ত সৎ চরিত্রবান ও ধার্মিক। তার অন্তর তাকওয়া ও খোদাভীতিতে ছিল পরিপূর্ণ ।
আর উত্তম চরিত্রের হওয়ায় সে সকলের নিকট বিশ্বস্ত ছিল। সবাই তাকে সম্মান-শ্রদ্ধা করত।
এবার মুল আলোচনায় আসা যাক।
সেই গ্রামে তিন ভাই ও তাদের এক বোন বসবাস করত। তারা তাদের বোনকে খুব আদর স্নেহ করতো। হঠাৎ তাদেরকে জিহাদের জন্য ডাকা হল। দুইদিন পর জিহাদের ময়দানে যেতে হবে। তারা বোনকে নিয়ে একটু দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। কারণ যুবতী বোনকে একা রেখে যাওয়া ঠিক হবে না।
তাই তারা পরস্পর আলোচনা করল যে গ্রামের বিশ্বস্ত কোন ব্যক্তির নিকট বোনকে রেখে যাবে। যেই ভাবা, সেই কাজ। পরদিন তারা বিশ্বস্ত লোকের সন্ধানে বের হলো। গ্রামবাসীরা তাদের বোনকে বারসিসার নিকট রেখে যেতে বলল। কেননা তাদের নিকটে বারসিসার চেয়ে উত্তম চরিত্রের আর কেউ ছিলনা। নিরাপদ ও হেফাজতে থাকবে তাদের বোন।
গ্রামবাসীর কথামতো তারা বারসিসার নিকট গেল। বারসিসাকে অনুরোধ করলো তাদের বোনকে হেফাজতে রাখার জন্য। কিন্তু বারসিসা রাজি হতে চাচ্ছিল না। কারণ যুবতী মেয়ের সাথে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
তাই সে বলল, 'দুঃখিত, আমি আপনাদের বোনের দায়িত্ব নিতে পারব না। শয়তানের কুমন্ত্রণা খুব সূক্ষ্ম। আমি অভিশপ্ত শয়তান থেকে পানাহ চাই।
এদিকে শয়তান তাদের কথাবার্তা শুনতে ছিল। বারসিসা ছিল উত্তম চরিত্রের অধিকারী। তাই শয়তান কোনোভাবেই তাকে বিপথগামী করতে পারছিল না। অবশেষে এলো সেই সুযোগ। সে এই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইল। বারসিসাকে কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করল।
শয়তান বলল, 'বারসিসা! তুমি ভুল করতেছো। তারা যদি তোমার চেয়ে ভালো কাউকে খুঁজে না পেয়ে, খারাপ কোন লোকের কাছে তাদের বোনকে রেখে যায়। তখন মেয়েটির কি সর্বনাশ হবে ভেবে দেখেছ কি? এই সর্বনাশের কারণ কি তোমার ভুলের জন্য হবেনা?
নরম দিলের মানুষ বারসিসা। শয়তানের কুমন্ত্রণা বুঝতে পারলো না। মেয়েটি ও তার ভাইদের বিপদের কথা ভেবে রাজি হয়ে গেল। মেয়েটিকে তার ঘরের বিপরীত পাশের একটি ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দিল। বারসিসা প্রতিদিন গির্জার সামনে মেয়েটির জন্য খাবার দিয়ে আসতে লাগলো। তারপর খাবার নিয়ে যাওয়ার জন্য মেয়েটিকে ডেকেই চলে আসতো।
বারসিসা চলে গেলে মেয়েটি খাবার নিয়ে যেত। তাই তাদের সাথে দেখা ও কথা হতো না। তাদের কর্মকান্ডে শয়তান অসন্তুষ্ট হতে লাগল। সে বারসিসাকে বলল, 'তুমি কেন মেয়েটাকে কষ্ট দিচ্ছো? তোমার কি উচিত নয় মেয়েটির খাবার তার ঘরের নিকট দিয়ে আসা? যদি তার ঘরের সামনে রেখে আসো, তাহলে মেয়েটিকে হেঁটে হেঁটে এতদূর আসতে হবে না। ফলে মেয়েটিকে কেউ দেখতে পাবে না। সে বদ লোকের নজর থেকে নিরাপদ থাকবে'।
বারসিসা রাজি হয়ে গেল। তারপর থেকে সে মেয়েটির ঘরের সামনে খাবার দিয়ে আসতে লাগলো।
শয়তান এবার আরো একটু শয়তানি বুদ্ধি খাটালো। সে কুমন্ত্রণা দিয়ে বলল, 'কেন তুমি মেয়েটির খাবার তার ঘরে দিয়ে আসো না? তাহলে তো মেয়েটিকে ঘর থেকে বের হওয়া লাগবে না। ফলে কেউ আর তাকে দেখতে পাবে না। সে আরো নিরাপদে থাকতে পারবে।
বারসিসা বুঝতে পারলো না এটা শয়তানের চক্রান্ত ছিল। এরপর থেকে সে মেয়েটির ঘরে যেয়ে খাবার দিয়ে আসতে লাগল। কিন্তু মেয়েটির সাথে কথা বলত না।
শয়তান অসন্তুষ্ট হলো। শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়ে বলল, 'তোমার উচিত মেয়েটার সাথে কথা বলা। তুমি কি লক্ষ্য করো না যে মেয়েটা সব সময় একা একা থাকে। এভাবে থাকলে তো সে একসময় পাগল হয়ে যাবে'।
বারসিসার মনে দয়া উদ্রেগ হলো। মেয়েটির অসহায়ত্বের কথা চিন্তা করে কথা বলতে শুরু করল। কথা বলতে বলতে একসময় তারা একে অপরের প্রতি দুর্বল হয়ে গেল। তাদের মধ্যে প্রেম ভালোবাসার সৃষ্টি হলো। কিছুদিন পর তারা জেনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হয়ে গেল। এর ফলে মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে গেল এবং কয়েক মাস পর একটি বাচ্চা জন্ম দিলো।
এবার শয়তান বলতে লাগলো, এটা তুমি কি করলে বারসিসা! মেয়েটির এত বড় সর্বনাশ করলে! তার ভাইয়েরা তোমার কুকর্ম দেখলে নিশ্চিত তোমাকে মেরে ফেলবে। তাই যদি বাঁচতে চাও, তাহলে দ্রুত তোমার পাপের ফসল সরিয়ে ফেলো'।
বারসিসা তাই করল। সে বাচ্চাটিকে খুন করে ওই ঘরের মেঝেতে পুতে রাখলো। কিন্তু বারসিসা চিন্তা মুক্ত হতে পারছিল না। এই সুযোগে শয়তান বলল, 'তুমি এক সন্তানকে তার মায়ের বুক থেকে কেড়ে নিয়ে হত্যা করলে। তুমি কি আশা করছ যে সে তার সন্তান হত্যার ঘটনা তার ভাইদের নিকট গোপন রাখবে?
বারসিসা বুঝতে পারল এবার তাকে কি করতে হবে। বাঁচার জন্য এবার সে মেয়েটিকে হত্যা করে বাচ্চাটির স্থানেই পুতে রাখলো। কিছুদিন পর মেয়েটির ভাইয়েরা জিহাদ শেষে গ্রামে ফিরে আসলো। তারা বোনকে ফিরিয়ে আনার জন্য বারসিসার নিকটে গেল।
তাদের দেখে বারসিসা ঘাবড়ে গেল। উপায়ন্তর না পেয়ে সে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলল, 'আপনাদের বোনের মারাত্মক অসুখ হয়েছিল। অনেক চিকিৎসা, সেবা-যত্ন করার পর তাকে বাচানো যায় নি। একথা বলতে বলতে সে অচেনা একটি কবরের নিকটে যেয়ে বলল, 'এখানে আপনাদের বোনকে দাফন করা হয়েছে।
তিন ভাই বারসিসার কথা বিশ্বাস করল। বোনের জন্য আফসোস করতে করতে তারা বাড়িতে চলে গেল।
রাত্রিবেলা তিন ভাই ঘুমিয়ে গেল। শয়তান স্বপ্নে তাদের বললো, 'বারসিসা একজন মিথ্যুক, প্রতারক, চরিত্রহীন। তোমাদেরকে সে মিথ্যা কথা বলেছে। সে তোমাদের বোনের সাথে দুষ্কর্ম করে তারপর তাকে হত্যা করেছে। তার লাশ তোমরা বারসিসার ঘরের মেঝে খুড়ঁলে দেখতে পাবে।
পরদিন সকালবেলা তাদের ঘুম ভেঙে গেল। তারা একে অপরকে তাদের স্বপ্নের কথা বলল এবং বুঝতে পারল যে সবাই একই স্বপ্ন দেখেছে।
সত্যতা যাচাই করার জন্য তারা বারসিসার দেখানো ওই কবর খুড়ঁল। কিন্তু ওই কবরে তাদের বোনকে দেখতে পেল না। তারপর তারা স্বপ্নে দেখা শয়তানের কথা অনুযায়ী বারসিসার ঘরের মেঝে খুড়ঁতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর তাদের বোনের সাথে একটি বাচ্চার লাশও দেখতে পেল।
এটা দেখে তাঁরা রাগে ফুঁসতে লাগলো। ঝাঁপিয়ে পড়ল বারসিসার উপর। উপযুক্ত বিচারের আশায় তাকে নিয়ে গেল রাজার কাছে। রাজা সমস্ত ঘটনা শুনে তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেন।
যথা সময়ে মৃত্যুদণ্ডের দিন চলে এলো। রাজার আদেশ মোতাবেক বারসিসাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে হত্যা করার জন্য। তখন শয়তান তার সামনে উপস্থিত হল। তবে এবার সে গাইবি কুমন্ত্রণা দিতে আসেনি। সে এসেছে মানুষের আকৃতিতে।
শয়তান বলল, তুমি কি জানো আমি কে? আমি হলাম অভিশপ্ত শয়তান। আজকে তোমার, এই যে করুণ পরিণতি হয়েছে এটা তো তোমার চিন্তা-ভাবণায় হয়নি। আমিইতো তোমাকে ওয়াসওয়াসা দিয়ে তোমাকে বিপদগ্ৰস্থ করেছি। আর এখন আমিই একমাত্ৰ তোমাকে বাঁচাতে পারি, যদি তুমি আমার কথা মত কাজ করো'।
বারসিসা বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। তবে শয়তানের কথা মানা ছাড়া বাঁচার তো কোনো পথ নেই। তাই বাধ্য হয়ে শয়তানের কথা মানতে প্রতিশ্রুতি দিল। শয়তান সুযোগ কাজে লাগিয়ে বলল, 'যদি তুমি আমাকে সেজদা করো, তাহলে আমি তোমাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করবো।
হতভাগা বারসিসা কিছুক্ষণ ভেবে শয়তানকে সিজদা করেই ফেলল। এর ফলে সে মুশরিক হয়ে গেল। সিজদা করা শেষ হলে শয়তান বলল, 'হে আদম সন্তান! আজ আমি তোমার থেকে দুরে সরে গেলাম। তোমার সাথে আমার বোঝা পড়া শেষ। আর আমি আল্লাহকে ভয় করি যিনি এই বিশ্বজগতের প্রতিপালক। আমাকে অনুসরণ করে তুমিও আমার মতো অভিশপ্ত হয়ে গেলে'।
একথা বলে শয়তান সেখান থেকে পলায়ন করল। তারপর বারসিসার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হলো। সে তার পাপের উপযুক্ত শাস্তি পেল। বিভিন্ন কিতাবে বর্ণিত আছে কেয়ামতের দিন, পৃথিবীর সকল মানুষের মতো বারসিসাকে যখন জীবিত করা হবে, তখন সে শয়তানকে সিজদা করতে করতে উঠে দাঁড়াবে।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ একটা একবার ভেবে দেখুন শয়তান কিভাবে তার কৌশল এর দ্বারা বারসিসাকে পথ ভ্রষ্ট করল। প্রথমাবস্থায় শয়তান বন্ধুর বেশ ধরে ভালো কাজের উৎসাহ দিল। কিন্তু এটা ছিল তার শয়তানি কারিশমা। সে প্রতিটি মানব সন্তানের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চরম শত্রু।
আল কুরআনুল কারীমে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, 'তাদের দৃষ্টান্ত শয়তান যে মানুষকে বলে কুফরি করো। অতঃপর যখন সে কুফরি করে; তখন শয়তান বলে, আমি তোমার থেকে মুক্ত। আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি'।
শয়তান তার কুটকৌশল এর দ্বারা মানুষকে জাহান্নামের দিকে অবধারিত করে। সে কখনোই সরাসরি এসে আপনাকে তার অধিনস্ত করবে না। কারণ সে জানে আপনি তাকে মানবেন করবেন না। তাই সে প্রথমে আপনাকে ভালো কাজের উৎসাহ দেবে। পরে ওই কাজের দ্বারাই আপনাকে বিপদগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে।
0 Comments