Islamic Bangla golpo: রোমের বাদশা ও ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহ আলাইহির জবাব

ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহ আলাইহির ঘটনা


আব্বাসীয় খলিফা মানসূরের যুগে কায়সার নামে রোমে এক বাদশাহ ছিল। অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় তার রাজ্য ছিল অনেক উন্নত ও সমৃদ্ধশীল। রাজ্যের জনগণ লেখাপড়ায়, জ্ঞান গরিমায় ছিল অনন্য। শুধু তাই নয়, তারা দৰ্শন, তৰ্কশাস্ত্ৰ ও আধুনিক যুদ্ধবিদ্যায় ছিল খুব পারদৰ্শী।

এসব কারণে বাদশাহ ও তার রাজ্যের লোকজনের মনে বড্ড অহংকার। অন্য জাতির লোকদের তারা তুচ্ছ ভাবত, হেয় করত। তাদেরকে অন্যায় ভাবে অত্যাচার-নীপিড়ন করত। 

ঠিক সেই সময়ে আরবের মুসলিমদের কালেমার দাওয়াত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। দাওয়াতে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন দেশ ও জাতির লোকেরা দলে দলে শান্তির ছায়াতলে আশ্ৰয় নিতে লাগল। পুরো পৃথিবীতে তখন মুসলিমদের আধিপত্য বিস্তার লাভ হতে লাগল।

মুসলমানদের এমন আধিপত্য বাদশাহ কায়সারের সহ্য হলো না। তার মাথাব্যাথা ও হিংসা-বিদ্বেষ শুরু হলো। তিনি রাজ্যের প্ৰধান ব্যক্তিবৰ্গের সাথে আলোচনায় বসলেন।

বাদশাহ বলল, "মুসলিমদের এবার থামাতে হবে। যেভাবে হোক তাদের ধৰ্মকে মাটির সাথে বিলীন করে দিতে হবে"।

তখন বাদশাহর সাথে সায় দিয়ে একজন বলল, "মহামান্য বাদশাহ! আরবের মুসলিমদের কিই-বা জ্ঞান আছে! কতটুকু বুদ্ধি রাখে তারা। তারাতো শুধু তলোওয়ার দিয়ে যুদ্ধ করেই বিজয় অৰ্জন করছে। 

কেউ বলল, "আমরা তাদের হারাবো কিভাবে?

বাদশাহ বললেন, "তাদেরকে হারাতে হবে বুদ্ধি ও জ্ঞানের বহর দিয়ে"।

কেউ একজন বলল, " সেটা কিভাবে?

বাদশাহ তখন উজিরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "আপনি যাবেন বাগদাদে মুসলমানদের বাদশার দরবারে। সেখানে মুসলমান সম্প্ৰদায়ের যতো আলেম, জ্ঞানী, গুণী পন্ডিত আছে তাদেরকে একত্ৰ হতে বলবেন। তারপর সবাইকে তিনটি প্রশ্ন করবেন। যদি  মুসলমানদের কেউই প্রশ্ন তিনটির সঠিক উত্তর না দিতে পারে তাহলে বাদশাহ আল-মানসূর রোমের বাদশাহ কায়সারকে কর দিবেন"।

বাদশাহর আদেশ পেয়ে উজির চললেন বাদশাহ মানসূরের দরবারে। সেখানে উপস্থিত হয়ে তিনি তিনটি প্রশ্নের প্রস্তাব দেন। উত্তর দিতে না পারলে এখন থেকে কর দিতে হবে। উজিরের  প্রস্তাব মেনে নেন বাদশাহ মনসূর। তার রাজ্যের জ্ঞানী, গুণীদের জমায়েত করলেন।

যথাসময়ে প্ৰশ্ন-উত্তর পৰ্ব শুরু হলো। রোমের বুদ্ধিমান উজির তখন একটি উচ্চ আসনে বসে সবাইকে প্রশ্ন করতে থাকেন।

তার প্ৰশ্ন তিনটি এমন জটিল ছিল যে বিজ্ঞ আলেম ও জ্ঞানীরা মিলেও তার জবাব দিতে পারল না।

তখন উজির মুসলমানদের এমন করুন অবস্থা দেখে হাসতে লাগল। লজ্জায় সবার মাথা নিচু হয়ে গেল। 

তাদের এমন অসহায় দশা দেখে অবশেষে ইমাম আবু হানিফা রহমতুল্লাহ আলাইহি (নোমান ইবনে সাবিত) উঠে দাঁড়ালেন।

এতক্ষণ তিনি দরবারে চুপটি করে বসেছিলেন। কোনো কথা বলেননি। তিনি ও তার দল হেরে যাবে এটা মানতেই পারলেন না। তিনি নিজেই প্ৰশ্নের উত্তর দেবেন।

তাই বাদশাহ আল-মানসূরের নিকট কথা বলার অনুমতি চাইলেন। সাথে সাথে বাদশাহ তাকে অনুমতি দিলেন। অনুমতি পেয়ে প্ৰথমেই তিনি রোমের উজিরকে বললেন, "জনাব উজির; আপনি তো একজন প্রশ্নকারী আর আমি উত্তরদাতা। কাজেই নিয়মানুযায়ী উঁচু আসনে প্রশ্নকারীর নয়, বরং উত্তর দানকারীর বসা উচিত। বাদশাহ মানসূর বললেন, "আপনি ঠিক বলেছেন। বিজ্ঞ উজিরের উচিত নয় উচ্চ আসনে বসে প্ৰশ্ন করা।

একথা শুনে উজির তার আসন থেকে নিচে নেমে গেলেন। আর ইমাম আবু হানিফা তার আসনে বসে গেলেন। এবার দরবারের 

পরিবেশ পাল্টে গেল। ইমাম আবু হানিফা রোমের উজিরকে বললেন, "এবার আপনার প্রশ্ন বলতে পারেন"।

প্ৰশ্ন 1. 

রোমের উজির - আমার প্রথম প্রশ্ন হলো, আল্লাহর আগে কি ছিল?

ইমাম আবু হানিফা (র) - আপনি নিশ্চয়ই এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ ইত্যাদি গুণতে পারেন। (বাংলা অনুবাদ অনুযায়ী এভাবে আসছে) তাহলে আমাকে আগে বলুন, একের আগে কোন সংখ্যা আছে"?

উজির - "একের আগে কোন সংখ্যাই নেই"।

ইমাম আবু হানিফাঃ তাহলে বুঝতেই পারছেন, এক তো অংকের একটি সংখ্যামাত্ৰ। আর আপনি নিজেই স্বীকার করছেন এক এর আগে আর কোনো সংখ্যা নেই, তাহলে আল্লাহ যিনি আসলে এক তার আগে কোনো কিছু কেমন করে থাকতে পারে!!

উত্তর শুনে উপস্থিত সবাই একদম অবাক হয়ে গেল। কি সুক্ষ্ম বুদ্ধি ইমাম আবু হানিফা।

প্ৰশ্ন 2.

উজির - "আমার দ্বিতীয় প্ৰশ্ন, আল্লাহর মুখ কোন দিকে?

ইমাম আবু হানিফা আপনি প্ৰথমে বলুন, প্ৰদীপের আলোর মুখ কোন দিকে? 

উজির - আলোর তো নিৰ্দিষ্ট কোনো দিক নেই। এটির চারদিকেই মুখ রয়েছে।

ইমাম আবু হানিফা - তাহলে বুঝতেই পারছেন, আলো সেতো একটি সাময়িক। তার মুখের জন্যে কোনো একটা নিৰ্দিষ্ট দিকে নেই। এটি চারদিকেই সমান। তাহলে বলুন, আসল নূর ও আলো যে আল্লাহ। যার নুরের আলোয় সারা বিশ্ব আলোকিত তার জন্যে কেমন করে একটা বিশেষ দিক নিৰ্দিষ্ট করা যেতে পারে।

প্ৰশ্ন 3.

উজির - আমার তৃতীয় প্ৰশ্ন, আল্লাহ এখন কি করছেন?

ইমাম আবু হানিফা (র) - আল্লাহ সৰ্বদা কাজে নিয়োজিত থাকেন। এখন তিনি যে সমস্ত কাজ করছেন তার মধ্যে একটি কাজ এই যে, তিনি আপনাকে উচ্চ আসন থেকে নিচে নামিয়ে আমাকে সেখানে বসিয়েছেন।

উত্তর শুনে উজিরের মুখমন্ডল একদম কালো হয়ে গেল। সে ভাবতেও পারছে না, কিভাবে এতো জটিল প্ৰশ্নগুলির উত্তর দিতে পারল। লজ্জায় তার মাথা একদম নিচু হয়ে গেল। এর সংগে তার বাদশাহ কায়সার ও তার জাতির গৰ্ব অহংকার মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

এভাবে ইমাম আবু হানিফা (র) এর দ্বারা মুসলমানদের বিজয় অৰ্জিত হয়। এই বিজয় ছিল ইসলাম ও সত্যের। এভাবেই যুগ যুগ ধরে মিথ্যা সত্যের কাছে হেরে গেছে। উজ্জ্বল ও দীপ্ত হয়ে উঠে সত্য।



Post a Comment

0 Comments